সি পি আই (এম-এল) লিবারেশনের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির মুখপত্র

মোদির হুংকারের জবাব দিল লাখো জনতা

সামন্তী-সাম্প্রদায়িক-ফ্যাসিবাদি-লুটেরাদের বিরুদ্ধে খবরদার র‍্যালি দখল নিল পাটনার রাজপথ

চার-লেনের চওড়া রাজপথে যতদূর চোখ যায়, মানুষ আর মানুষ। এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত মঞ্চের আওয়াজ কানে পৌঁছে দিচ্ছে মাইক। আগের দিন থেকে দূর-দূরান্তের লোক জড়ো হতে শুরু করেছে। স্টেশন থেকে, গঙ্গার দিক থেকে পৌঁছে যাচ্ছে নতুন নতুন মিছিল। সিওয়ান জেলার পাশাপাশি দুই গ্রাম থেকে দু’টি মিছিলকে দেখা গেল। নেতৃত্বে দুই মুখিয়া। এক পথচারী জানতে চাইলেন, কিসের মিছিল? তুরন্ত জবাব আসল ‘মোদী কা জবাব দেনে পাটিয়া (পার্টির) কা র‍্যালি’। সকাল আটটা নাগাদ মঞ্চের কাছাকাছি যাওয়ার জায়গা সঙ্কুলান। ন’টা থেকে শুরু হল গান। ‘চাহে লাঠি গোলি চালাওয়ে, চাহে ভেজ জেহলিয়া (জেল)। নহিয়ে মানবই যাইব করবই খবরদার র‍্যালিয়া’। সুর পৌঁছে গেল আর-ব্লক থেকে আই-টি গোলচক্করে। ওদিকে মানুষের ঢেউয়ের মাঝে ভেসে রয়েছে মঞ্চ। লাল পতাকায় মোড়া। সেদিকে হাঁটতে হাঁটতে দেখা গেল কোথাও মায়ের হাত ধরে চলেছে ছেলে। হাতে লাল পতাকা। মাথায় পার্টির নাম লেখা পট্টি বেঁধে যুবকের গর্বিত মুখ। কোথাও ফুটপাথের ধারে গাছের ছায়ায় লিট্টি-চোখা-রুটি-ছাতু খেয়ে নেওয়া। হার্ডিঞ্জ পার্কের সামনে সারে সারে বাস-ভ্যান-ট্র্যাক্টর-লরি। রাত-যাপনের তাঁবু। কিন্তু সমতলে দাঁড়িয়ে গোটা সমাবেশকে দেখা যায় কই। মঞ্চের পাশে আট-তলা উঁচু এজি বিল্ডিং-এর ছাত। সেখানে উঠেও জনতার শেষ দেখা গেল না।

পাটনার ঐতিহাসিক বীর চাঁদ প্যাটেল মার্গ। একদিকে ১৮৫৭-র আন্দোলনের বিদ্রোহী নেতা কুনওয়ার সিং-এর মূর্তি। অন্যদিকে জয়প্রকাশ নারায়ণের। ১৯৭৪ সালে এখানে জয়প্রকাশ নারায়ণকে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ চলাকালীন লাঠিপেটা করা হয়। আর এখানেই সিপিআইএমএল-এর ‘খবরদার র‍্যালি’ সামন্তী সাম্প্রদায়িক ফ্যাসিবাদী লুটেরাদের সোচ্চারে জানিয়ে দিল তাদের আগ্রাসনকে রুখতে বিহারের জনতা প্রস্তুত। কথা হচ্ছিল সিওয়ান থেকে আসা কিছু সাথীর সাথে। নিজেদের খাবার, ত্রিপল নিজের সাথে এনেছেন তারা। বাসের ভাড়া বাবদ মাথা পিছু দেড়শ টাকা খরচা করে পাটনা এসেছেন। তিনদিন আগে পাটনার গান্ধী ময়দানে হয়ে যাওয়া হুংকার র‍্যালির সাথে তফাৎ স্পষ্ট। সেদিন ভাড়া করা হয়েছিল এগারোটি ট্রেন, হাজার হাজার বাস। শুধু তাই নয়, লোক টানতে খাবার-হাতখরচের ঢালাও ব্যবস্থাও ছিল। তিন দিন পরের খবরদার র‍্যালিও হওয়ার কথা ছিল গান্ধী ময়দানেই। কিন্তু র‍্যালির আগের রাতে পুলিশ প্রশাসন খবর দেন, তারা তখনও গান্ধী ময়দানকে বোমামুক্ত করতে পারেন নি। এই অবস্থায় পরিবর্তিত জায়গায় এক রাতের মধ্যে র‍্যালির আয়োজন করা পার্টির কাছে ছিল এক বড়ো চ্যালেঞ্জ। কিন্তু, পরের দিন গোটা পাটনাই হয়ে উঠল গান্ধী ময়দান। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধির মুখে শোনা গেল, কেবল সি পি আই (এম এল) ই পারে – বোমাতঙ্কের পরিবেশের মধ্যে দাঁড়িয়ে এই ধরণের সমাবেশ করতে। ‘দৈনিক জাগরণ’ পত্রিকার সাংবাদিককে জেহানাবাদের মিত্রি দেবী আর দেবতী দেবী বলছিলেন, ‘ভয় করলে কি র‍্যালিতে আসতাম?’ আর ‘হিন্দুস্তান’ পত্রিকার প্রশ্নের জবাবে মহিলারা সাফ জানান, ‘ভয় পেয়ে যদি র‍্যালিতে না আসি, তবে পার্টির কাজ চলবে কি করে? অধিকারের জন্য লড়ব কি করে? বোমা গুলিতে ভয় পাই না।’ ৩১ তারিখের ‘হিন্দুস্তান’ কাগজ মিছিলে মহিলাদের সংখ্যা সম্পর্কে লিখল, ‘আধি আবাদী কি পুরী ভাগীদারী’।

দুপুর এগারোটায় শহীদদের স্মৃতিতে দু মিনিটের নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে সভার কাজ শুরু হয়। আগত জনতাদের অভ্যর্থনা জানান বিহার রাজ্য কমিটির সম্পাদক কমরেড কুনাল। কমরেড কে ডি যাদব এর সভাপতিত্বে সভার কাজ পরিচালনা করেন ইনকিলাবি মুসলিম কনফারেন্স এর বিহার রাজ্য সভাপতি আনওয়ার হোসেন। তার ভাষনে পার্টির সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য বলেন, ২০১৪-র নির্বাচনকে নেতার নয়, নীতির নির্বাচন করে তুলতে হবে। কর্পোরেট লুঠ, দুর্নীতি, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি, সাম্প্রদায়িক হিংসা ও সংখ্যালঘুদের ওপর আগ্রাসনের নীতিকে বদলাতে হবে। নব্বই দশকের লক্ষ্মণপুর-বাথে, বাথানিটোলা, মিয়াপুর, নাগরী বাজারের দলিত গণহত্যার ঘটনাগুলিতে নিম্ন আদালত ২০১০ এ দোষীদের শাস্তি বিধান করেছিল। কিন্তু হাইকোর্ট তাদের ছেড়ে দিয়েছে। তাহলে গণহত্যাকারীরা কি অন্য গ্রহ থেকে আসছে? এই সব রায়ের মধ্য দিয়ে বিচারকেই হত্যা করা হয়েছে। আক্রান্তদের আরও একবার শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। গোটা নভেম্বর মাস জুড়ে এই নিয়ে প্রচারাভিযান ও সই সংগ্রহ চলবে। ১০ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে সিপিআইএমএল লাখো লাখো সই নিয়ে দিল্লি অভিযান করবে। ১৮ ডিসেম্বর, কমরেড বিনোদ মিশ্রের মৃত্যু দিবসে দিল্লিতে গণশুনানির পর এই স্বাক্ষরগুলি রাষ্ট্রপতির কাছে পৌঁছে দেবে।

দীপঙ্কর বলেন, বিহার সহ সারা দেশ জুড়ে সাম্প্রদায়িক ও সামন্তী শক্তির দাপাদাপি বাড়ছে। প্রধানমন্ত্রী পদে বিজেপির প্রার্থীর যাত্রা এই আবহাওয়াতেই কেবল মসৃণ হতে পারে। দাঙ্গা সংগঠিত করে তারা ক্ষমতায় আসতে চায়। কিন্তু বিহারকে তারা কিছুতেই গুজরাটে রূপান্তরিত করতে পারবে না। এক একটা বোমা বিস্ফোরণের পর নিরীহ মুসলিম যুবকদের জেলে ভরা হয়। কয়েকদিন পরে তাদের কি হল সে খবর আর কেউ রাখে না। দ্বারভাঙ্গার ঘটনায় নীতীশ কুমারের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন করে তিনি বলেন বিহারের যে সমস্ত যুবকদের সন্ত্রাসের ঘটনায় অভিযুক্ত করে জেলে পোরা হয়েছে তাদের কোনো বিচার হয়নি। এই বিষয়ে নীতীশ সরকারকে শ্বেতপত্র প্রকাশ করতে হবে। এই জনসভার দিনেই আয়োজিত দিল্লির সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী কনভেনশন সম্পর্কে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, বলা হচ্ছে এই সমাবেশ নির্বাচনী কোনও জোট নয়, বরং একটি সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী প্রচেষ্টা। কিন্তু এতে সি পি আই (এম এল) কে কেন ডাকা হল না? আমাদের সঙ্গে অনেক মতপার্থক্য সত্ত্বেও জিজ্ঞাসা করতে হচ্ছে আরজেডি কে কেন ডাকা হল না? গুজরাট দাঙ্গার পর লোক জনশক্তি পার্টির রাম বিলাস পাসওয়ান এনডিএ সরকারের মন্ত্রীত্ব ছেড়ে ছিলেন। তাকেও ডাকা হয় নি। অথচ যে নীতীশ কুমার ১৭ বছর ধরে বিজেপির সেবা করলেন তাকেই সাম্প্রদায়িকতা বিরোধিতার নায়ক করে তোলা হচ্ছে!

অনেকে বলাবলি করছে লালু প্রসাদের জেলে যাওয়ার সাথে সাথেই নাকি দুর্নীতি শেষ হল। কিন্তু ভুলে যাওয়া হচ্ছে পশুখাদ্য কেলেঙ্কারি ও অন্যান্য দুর্নীতিতে জে ডি ইউ এর নীতীশ কুমার ও শিবানন্দ তেওয়ারীর ভূমিকা। কংগ্রেসের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জগন্নাথ মিশ্রের ভূমিকা। ২ জি, কয়লা অন্যান্য বহু দুর্নীতিতে যেখানে লাখ লাখ কোটি টাকা নয়ছয় হচ্ছে। সেটা ভুলে যাওয়া হচ্ছে । সমস্ত দোষীকে অবশ্যই শাস্তি দিতে হবে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও । নীতীশ সরকারের উন্নয়ন ফানুসের পর্দা ফাটিয়ে তিনি বলেন এখানে শুধু বিদ্যুৎ, জল, রাস্তা আর শিক্ষার সম্পর্কে গল্পকথাই শোনানো হচ্ছে। গত কুড়ি বছর ধরে বিহারে দলিত, মহা দলিত, মুসলিম, পসমন্দা মুসলিমদের নামে ভোট নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু কাজ করা হচ্ছে সামন্তী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির স্বার্থে।

পলিটব্যুরোর সদস্য কমরেড কবিতা কৃষ্ণাণ বলেন সঙ্ঘ পরিবারের হুঙ্কার বিহারে এই প্রথম নয়। ১৯৯৬-৯৭ তে বাথে এবং বাথানিটোলায় । ২০০২ তে গুজরাটে নারী ও শিশুরা এই রক্তপিপাসু হুঙ্কার শুনেছিলো। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা যখন দেশ স্বাধীন করার লড়াইয়ে ব্যস্ত ছিলেন। আম্বেদকর যখন সাম্য ও স্বাধীনতার লক্ষ্যে সংবিধান রচনা করছিলেন। তখন নারী ও দলিতদের দমন করার কথা বলা মনুস্মৃতিকে দেশের সংবিধান করে তোলার কথা বলছিল আর এস এস। প্রশ্ন হলো এই সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখতে পারে কোন শক্তি? নীতীশ কুমার যিনি গুজরাত গণহত্যার সময় নীরব ছিলেন, যার দলে রয়েছে আরএসএস-এর মদতপ্রাপ্ত রণবীর সেনাভুক্ত সুনীল পাণ্ডের মত বিধায়ক- তারা রুখবে সঙ্ঘীদের? বিহারের যে ভূমিহীন মহিলারা রণবীর সেনা ও সামন্তী শক্তির থেকে মর্যাদা ও অধিকার ছিনিয়ে এনেছেন, তারাই মোদীর ফাসিস্ট হুঙ্কার থামাতে পারেন। মন্দির আন্দোলন ও মণ্ডল বিরোধী জোয়ারের পর্বে উত্তর ভারতের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যারা এবিভিপি কে পরাস্ত করেছিলেন, সেই ছাত্ররা জানেন কীভাবে মোদীর হুঙ্কারের জবাব দিতে হয়। সমস্ত জায়গাতে ভগৎ সিং এর তুলে ধরা লাল পতাকাই ফাসিস্তদের দৃঢ়তার সঙ্গে প্রতিরোধ করতে সক্ষম।

সারা ভারত প্রগতিশীল মহিলা সমিতির সাধারণ সম্পাদক মীনা তেওয়ারী তার ভাষণে বলেন খাপ পঞ্চায়েত ও বিজেপি সংখ্যালঘুদের ওপর সাম্প্রদায়িক হিংসার পাশাপাশি মহিলাদের নিরাপদ রাখার নামে তাদের স্বাধীনতার ওপরই আক্রমণ নামিয়ে আনে। ধর্ষণে অভিযুক্ত আসারাম বাপুকে নির্লজ্জভাবে সমর্থন দেওয়ার ঘটনা মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার নামে বিজেপির প্রচারের স্বরূপ ফাঁস করে দিয়েছে। দিল্লীর জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সদ্যনির্বাচিত অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ আকবর ও অনুভূতি মোদির দিল্লী সফরের সময় ছাত্রদের বিরোধ প্রদর্শনের কথা বলেন।

পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ধীরেন্দ্র ঝা এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মহম্মদ সেলিমের বক্তব্যে ছিল বিহারে ও অন্যত্র মুসলিম যুবকদের কীভাবে সন্ত্রাসের ঘটনাগুলোর পর নির্বিচারে ‘ডাইনি খোঁজার মত করে’ অপরাধী সাব্যস্ত করা হচ্ছে তার কথা। সেলিম বলেন মোদির রাজনৈতিক উত্থান হয়েছে সংখ্যালঘু মানুষের রক্তস্রোতের ওপর দিয়ে। আর সেই নরখাদক-কে ১৭ বছর পালন পোষণ করে নীতিশ আজ ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশ পড়তে চাইছেন। মোদি শুধু সংখ্যালঘু মুসলমানদের কাছেই বড় বিপদ নন। তিনি কর্পোরেটদের পেটোয়া লোক এবং আমেরিকার ধামাধারীও বটে। তাই তার উত্থান ভারতের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার পক্ষেও ভয়ানক। কিষাণ মহাসভার অধ্যক্ষ রাজারাম সিং বলেন বিভিন্ন নীতিগত প্রশ্নে বিজেপির অবস্থান কংগ্রেসের মতোই আর গোয়ায় বেআইনি খননের সমর্থনে মোদীর উক্তি দেখিয়ে দেয় তার অবস্থান। কংগ্রেস বা বিজেপি যারই মদত থাকুক না কেন, বেআইনি লুঠতরাজকে জনতা সব সময়েই সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করবে। সমাবেশের অন্যান্য বক্তাদের মধ্যে ছিলেন কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রামেশ্বর প্রসাদ, প্রাক্তন বিধায়ক মেহবুব আলম, বিপ্লবী যুব অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি অমরজিৎ কুশওয়াহা ও আইসার সাধারণ সম্পাদক অভ্যুদয়। সভা শেষ হয় ‘জাগতে রহো’ জন অভিযানের ডাক দিয়ে। বিহারে সামন্তী হিংসা বা সাম্প্রদায়িক উন্মাদনার বিরুদ্ধে জনতার সতর্ক পাহারা চলবে।

বীর চাঁদ প্যাটেল পথ আস্তে আস্তে খালি হয়ে যায়। লাল পতাকা কাঁধে ফিরতি মিছিল পাড়ি দেয় বাড়ির দিকে। গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যাবে র‍্যালির বার্তা। বিহারকে গুজরাত করতে দেওয়া যাবে না। আর কোথাও ঘটবে না লছমনপুর-বাথে। ‘গরীব কে গদ্দার সুনো সামন্তন কে ইয়ার। খবরদার খবরদার। গুজরাত না হ, হউবে ই বিহার।’